
স্ত্রী দরজা আটকে রেখেছিলেন, স্বামী পালাচ্ছিলেন, আর খাটের নিচে পড়ে ছিল নিষ্পাপ রামিসার ক্ষতবিক্ষত দেহ।
সকাল সাড়ে দশটায় স্কুল থেকে ফিরছিল রামিসা। পাশের ফ্ল্যাটের দরজাটা পার হতে পারলে নিজের বাসা। কিন্তু সেই দরজাটাই ছিল একটি ফাঁদ। ভেতরে অপেক্ষা করছিলেন মাত্র দুই মাস আগে ভাড়া আসা সোহেল রানা। যা হলো তা বাংলাদেশের প্রতিটি মা-বাবার বুকে ছুরির মতো বিঁধেছে। সাত বছরের একটি শিশু। দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। নিজের বাসার পাশে সে নিরাপদ নয়, এই বাস্তবতা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তারকে (৭) ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। পল্লবী থানার সেকশন-১১, মিল্লাত ক্যাম্প সংলগ্ন রোড-৭-এর একটি পাঁচতলা ভবনের তৃতীয় তলায় পাশের ফ্ল্যাটে শিশুটিকে ধারালো ছুরি দিয়ে মাথা বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করা হয়।
ঘটনার পুনর্গঠন করলে যে চিত্র উঠে আসে তা আরও মর্মান্তিক। রামিসার পরিবার ওই ভবনে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বসবাস করছে। রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে চাকরি করেন। মা পারভীন আক্তার। দুই মেয়ের মধ্যে রামিসা ছোট। সেদিন সকালে রামিসা স্কুলে যাওয়ার জন্য বের হয়েছিল। স্কুলে না পাঠিয়ে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বাসায় না ফেরায় পরিবার খোঁজা শুরু করেন। রামিসার মা পাশের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে রামিসার স্যান্ডেল দেখতে পান।
বাইরে কোথাও না পেয়ে পাশের বাসার বন্ধ দরজায় ডাকাডাকি করলেও সাড়া মেলে না। পরে ৯৯৯-এ জানানো হয়। পুলিশ দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে স্তব্ধ হয়ে যায়। ফ্ল্যাটের খাটের নিচ থেকে রামিসার মাথাবিহীন মরদেহ এবং বাথরুম থেকে বালতিতে বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধার করা হয়।
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। পুলিশের ধারণা, প্রতিবেশীর বিকৃত যৌনলালসার শিকার হয়েছিল শিশুটি। নির্যাতন বা রক্তক্ষরণের বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়ার ভয়েই তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে আলামত গোপন ও মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে শিশুটির মাথা ও হাত কেটে ফেলা হয়েছিল।
অভিযুক্ত দম্পতির ভূমিকা ছিল পরিকল্পিত। হত্যার পরপরই সোহেল রানা গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়। তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ভেতর থেকে দরজা বন্ধ রেখে স্বামীকে পালানোর সময় দিয়েছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। মাত্র ৭ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেল রানা এবং ঘটনাস্থল থেকে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করে।
তদন্তে জানা গেছে, অভিযুক্ত দম্পতি মাত্র দুই মাস আগে পাশের ফ্ল্যাটে ভাড়া আসেন। সোহেল রানা পেশায় রিকশার মেকানিক এবং তার বিরুদ্ধে নাটোরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা রয়েছে। পুলিশ তাকে বিকৃত যৌনরুচির মানুষ বলে চিহ্নিত করেছে।
এই ঘটনা বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার উদ্বেগজনক ধারারই অংশ। মাদকাসক্ত সোহেল রানা স্কুল থেকে ফেরার পথে শিশুটিকে কৌশলে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে গিয়ে বাথরুমে নিয়ে গলা কেটে হত্যা করে। রামিসার বাবা-মা বাক্রুদ্ধ হয়ে বসে আছেন। সারাদেশে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে।
তাছাড়া এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, এটি কেবল মিরপুরের গল্প নয়।এটি সাভারের গল্পও।
কারণ সাভার-আশুলিয়ার বাস্তবতা আরও জটিল।১৫-২০ লাখের বেশি মানুষের বসবাস এই শিল্পাঞ্চলে। প্রতিদিন নতুন ভাড়াটিয়া আসে। নতুন শ্রমিক আসে। নতুন মুখ আসে। কিন্তু তাদের পরিচয় যাচাইয়ের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। বাড়ির মালিকরা অনেক সময় শুধু অগ্রিম টাকা পেলেই রুম ভাড়া দেন। থানায় তথ্য যায় না। প্রতিবেশীরা কিছু জানে না। ফলে কে অপরাধী, কে মানসিকভাবে বিপজ্জনক, কে পলাতক আসামি, তা বোঝার সুযোগই থাকে না।
আর এখানেই লামিসার ঘটনা সাভারের জন্য ভয়ংকর গুরুত্বপূর্ণ।
গত কয়েক মাসে সাভার-আশুলিয়ায় ধর্ষণ, হত্যা, গুম, ছিনতাই ও সিরিয়াল কিলিংয়ের ঘটনাগুলো দেখলে বোঝা যায়, অপরাধীরা এখন অনেক ক্ষেত্রেই “অপরিচিত” নয়। তারা আশেপাশেই থাকে। একই ভবনে থাকে। একই গলিতে থাকে। একই বাজারে চলাফেরা করে।
এই ঘটনায় পুলিশের দ্রুত অভিযান অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।
#SACU বিশ্লেষণ:
রামিসা হত্যাকাণ্ড একইসাথে বেশ কয়েকটি গুরুতর সামাজিক ব্যর্থতার দিকে আঙুল তুলছে।
প্রথমত, ভাড়াটিয়া যাচাইয়ের অনুপস্থিতি। সোহেল রানা মাত্র দুই মাস আগে ভাড়া এসেছিলেন। তার বিরুদ্ধে নাটোরে সন্ত্রাসবিরোধী মামলা ছিল। অথচ বাড়িওয়ালা বা পাড়া-প্রতিবেশী কেউ জানত না। বাংলাদেশে ভাড়াটিয়া যাচাইয়ের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই।
দ্বিতীয়ত, শিশু সুরক্ষার কাঠামোগত অভাব। ১৭ বছর ধরে বসবাসকারী পরিবারের শিশু মাত্র দুই মাসের ভাড়াটিয়ার হাতে নিরাপদ ছিল না। আবাসিক এলাকায় শিশুর চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনো সামাজিক কাঠামো নেই।
তৃতীয়ত, স্ত্রীর সক্রিয় সহযোগিতা। স্বপ্না আক্তার দরজা আটকে রেখে স্বামীকে পালাতে সহায়তা করেছেন। এটি প্রমাণ করে হত্যাকাণ্ডটি একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ।
SACU মনে করে,
বাড়িওয়ালাদের জন্য ভাড়াটিয়া পুলিশ ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক করা, প্রতিটি ওয়ার্ডে ডিজিটাল ভাড়াটিয়া ডাটাবেজ তৈরি করা, শিশু যৌন নির্যাতন মামলায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া এই ধরনের অপরাধ থামানো সম্ভব নয়। সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তার উভয়ের সর্বোচ্চ শাস্তি এখন জাতীয় দাবি।
সচেতনতামূলক বার্তা:
বাড়িওয়ালারা ভাড়াটিয়া রাখার আগে অবশ্যই স্থানীয় থানায় পুলিশ ভেরিফিকেশন করুন। শিশুকে কখনো অপরিচিত বা নতুন প্রতিবেশীর সাথে একা থাকতে দেবেন না। পাশের ফ্ল্যাটে বা বাসায় সন্দেহজনক কার্যকলাপ দেখলে সঙ্গে সঙ্গে ৯৯৯-এ জানান। শিশু নির্যাতন বা হত্যার শিকার হলে জাতীয় শিশু হেল্পলাইন ১০৯৮-তে যোগাযোগ করুন। রামিসার মৃত্যু যেন বৃথা না যায়, এই সচেতনতাই তার প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা।
আপনার মতামত লিখুন :